ADVOCATE
ABDUR RAHMAN ASAD

TANGAIL JUDGE COURT OF BANGLADESH

ওয়ারিশন ও সাকসেশন সার্টিফিকেট কি এক? জানুন আইনি পার্থক্য

09 Oct, 2026 আসাদ টিম সিভিল আইন

ভূমিকা ও পটভূমি

বাংলাদেশে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বণ্টন এবং তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি উত্তরাধিকারীদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত দুটি দলিল হলো ওয়ারিশন সার্টিফিকেট এবং সাকসেশন সার্টিফিকেট। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়শই একটি ভুল ধারণা কাজ করে যে এই দুটি সনদ হয়তো একই জিনিস। কিন্তু আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুটির কার্যকারিতা, ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভুল ধারণার কারণে অনেক সময় সাধারণ মানুষ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন। একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে আজকের আলোচনায় এই দুই সার্টিফিকেটের মধ্যকার মৌলিক ও আইনি পার্থক্যসমূহ সহজ ভাষায় বিশ্লেষণ করব।


ওয়ারিশন সার্টিফিকেট কী এবং এর প্রয়োজনীয়তা

ওয়ারিশন সার্টিফিকেট বা ওয়ারিশ সনদ হলো এমন একটি দালিলিক প্রমাণ যা মৃত ব্যক্তির বৈধ উত্তরাধিকারীদের তালিকা প্রকাশ করে। এটি সাধারণত স্থানীয় সরকারের আওতাধীন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক ইস্যু করা হয়ে থাকে। জমি বা ফ্ল্যাটের মতো স্থাবর সম্পত্তির নামজারি বা মিউটেশন, মালিকানা পরিবর্তন, এবং স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে এই সনদটি প্রধান দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এটি কোনো বিচার বিভাগীয় দলিল নয়, বরং একটি প্রশাসনিক প্রত্যয়নপত্র মাত্র।

সাকসেশন সার্টিফিকেট কী এবং এর আইনি ভিত্তি

মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া অস্থাবর সম্পত্তি যেমন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের টাকা, ফিক্সড ডিপোজিট বা এফডিআর, প্রাইজবন্ড, শেয়ার মার্কেট ইনভেস্টমেন্ট, বা ডাকঘর সঞ্চয়পত্র উত্তোলনের জন্য আদালত কর্তৃক যে সনদ দেওয়া হয় তাকে সাকসেশন সার্টিফিকেট বলা হয়। এটি সম্পূর্ণ একটি বিচারিক প্রক্রিয়া। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, আদালত কর্তৃক এই সনদ ইস্যু না করা পর্যন্ত কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান মৃত ব্যক্তির অর্থ তার উত্তরাধিকারীদের নিকট হস্তান্তর করতে বাধ্য নয়।

১৯২৫ সালের উত্তরাধিকার আইনের ৩৭২ ধারা অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া অস্থাবর আর্থিক সম্পত্তির দাবিদারদের আইনি বৈধতা যাচাইয়ের পর বিজ্ঞ জেলা জজ বা উপযুক্ত দেওয়ানি আদালত সাকসেশন সার্টিফিকেট মঞ্জুর করেন।

ওয়ারিশন ও সাকসেশন সার্টিফিকেটের মূল পার্থক্যসমূহ

এই দুটি সার্টিফিকেটের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট করার জন্য নিচে প্রধান বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো:

  1. ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ: ওয়ারিশন সার্টিফিকেট প্রদান করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি যেমন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর। অন্যদিকে, সাকসেশন সার্টিফিকেট শুধুমাত্র বিজ্ঞ দেওয়ানি আদালত বা জেলা জজ আদালত প্রদান করে থাকে।
  2. সম্পত্তির ধরণ: জমিজমা, বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মতো স্থাবর সম্পত্তির প্রশাসনিক প্রয়োজনে ওয়ারিশন সার্টিফিকেট ব্যবহৃত হয়। অপরপক্ষে, ব্যাংক ব্যালেন্স, প্রভিডেন্ট ফান্ড, সঞ্চয়পত্র বা বীমার টাকার মতো অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা দাবির ক্ষেত্রে সাকসেশন সার্টিফিকেট আবশ্যক।
  3. আইনি গুরুত্ব: ওয়ারিশন সনদ কোনো আদালতের ডিক্রি নয়, তাই ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ওয়ারিশন সনদের ভিত্তিতে অর্থ পরিশোধে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। কিন্তু সাকসেশন সার্টিফিকেট হলো একটি চূড়ান্ত আদালতের আদেশ, যা অমান্য করার সুযোগ কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেই।
  4. সরকারি খরচ ও ফি: ওয়ারিশন সনদ সংগ্রহে নামমাত্র বা অত্যন্ত সামান্য ইউনিয়ন পরিষদ ফি প্রয়োজন হয়। কিন্তু সাকসেশন সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে আদালতের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ কোর্ট ফি জমা দিতে হয়, যা দাবিকৃত অর্থের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।

আদালত থেকে সাকসেশন সার্টিফিকেট পাওয়ার প্রক্রিয়া

আদালত থেকে সাকসেশন সার্টিফিকেট গ্রহণ করার জন্য একটি নিয়মতান্ত্রিক আইনি পথ অনুসরণ করতে হয়। নিচে ধাপগুলো সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো:

  1. আবেদন দাখিল: মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার যেকোনো একজন যোগ্য ওয়ারিশকে বিজ্ঞ জেলা জজ আদালতে সাকসেশন মোকাদ্দমা দায়ের করতে হয়।
  2. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: আবেদনের সাথে মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সনদ, ওয়ারিশন সার্টিফিকেট, ব্যাংকের হিসাব বিবরণী বা সঞ্চয়পত্রের কপি এবং জাতীয় পরিচয়পত্র দাখিল করতে হবে।
  3. বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ: আদালত আবেদনটি পাওয়ার পর অন্যান্য ওয়ারিশদের প্রতি নোটিশ ইস্যু করেন এবং প্রয়োজনে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আদেশ দেন যাতে অন্য কারো কোনো আপত্তি থাকলে তা জানাতে পারেন।
  4. শুনানি ও আদেশ: বিজ্ঞ আদালতের শুনানি শেষে কোনো আপত্তি না থাকলে বিচারক সাকসেশন সার্টিফিকেট মঞ্জুর করার আদেশ দেন। অতঃপর নির্দিষ্ট কোর্ট ফি জমা দিলে আদালত সাকসেশন সার্টিফিকেট বা উত্তরাধিকার পত্র প্রদান করেন।

উপসংহার ও আইনি পরামর্শ

পরিশেষে বলা যায়, ওয়ারিশন সার্টিফিকেট এবং সাকসেশন সার্টিফিকেট কখনোই এক নয়। স্থাবর সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ বা নামজারির কাজে আপনার স্থানীয় কাউন্সিলর বা চেয়ারম্যানের দেওয়া ওয়ারিশন সনদই যথেষ্ট। তবে মৃত স্বজনের ব্যাংক হিসাবের টাকা বা সঞ্চয়পত্র তুলতে গেলে আপনাকে অবশ্যই বিজ্ঞ দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে সাকসেশন কেস দায়ের করে সাকসেশন সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে। যেকোনো একটিকে অন্যটির বিকল্প ভাবলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে শুরুতেই একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে সঠিক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি পোস্টটি শেয়ার করুন:

অন্যদের আইনি সচেতনতা বৃদ্ধিতে পোস্টটি সহায়ক হতে পারে।
Facebook WhatsApp LinkedIn

পেশাদার আইনি পরামর্শ প্রয়োজন?

যেকোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি, জমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা হাইকোর্টের রিট পিটিশনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলুন এডভোকেট আব্দুর রহমান আসাদের সাথে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন WhatsApp করুন কল করুন

সাম্প্রতিক অন্যান্য আইনি পোস্ট

পারিবারিক আইন

মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার বা ওয়ারিশান সনদ তোলার সম্পূর্ণ নিয়ম

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

জমি কেনার আগে অবশ্যই যাচাই করুন এই ৫টি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র!

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

ভূমি উন্নয়ন কর কেন নিয়মিত পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক?

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

হেবা বা সম্পত্তি দান করলে কি তা ফেরত নেওয়া যায়?

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

কাউকে টাকা ধার দিলে ভবিষ্যতে আইনি সুরক্ষার জন্য ৫টি জরুরি প্রমাণ

বিস্তারিত পড়ুন