ভূমিকা ও পটভূমি
কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, এবং অন্যান্য আইনি পাওনাদি আইনসম্মত উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন বা হস্তান্তরের জন্য যে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণের প্রয়োজন হয়, তাকে ওয়ারিশান সনদ বা উত্তরাধিকার সনদ বলা হয়। বাংলাদেশের প্রচলিত পারিবারিক ও উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির বৈধ উত্তরাধিকারী কারা তা নির্ধারণ করে এই সনদ দেওয়া হয়। একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে আমি প্রায়ই মক্কেলদের এই সনদ সংগ্রহ করার সঠিক আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে থাকি। সঠিক নিয়ম না জানার কারণে অনেক সময় সাধারণ মানুষ দীর্ঘ আইনি জটিলতার মুখে পড়েন। তাই এই বিষয়ে সম্যক ধারণা থাকা প্রতিটি নাগরিকের জন্যই অত্যন্ত জরুরি।
কোথায় এবং কার নিকট আবেদন করবেন?
ওয়ারিশান সনদের জন্য প্রথমে স্থানীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হয়। মৃত ব্যক্তি ঢাকা বা অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাসিন্দা হলে সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে এই সনদ সংগ্রহ করতে হবে। পৌরসভা এলাকার ক্ষেত্রে মেয়র এবং ইউনিয়ন এলাকার ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে এই সনদ প্রদান করা হয়। এছাড়া স্থাবর সম্পত্তি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জটিলতার ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫ (Succession Act, 1925) এর বিধান অনুযায়ী উপযুক্ত দেওয়ানি আদালত থেকেও সাকসেশন সার্টিফিকেট বা উত্তরাধিকার সনদ নিতে হয়।
ওয়ারিশান সনদের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে ওয়ারিশান সনদ পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু দলিলাদি দাখিল করতে হয়। নিচে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা দেওয়া হলো:
- মৃত্যু সনদ: মৃত ব্যক্তির রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের দেওয়া বা জন্ম-মৃত্যু রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত মূল মৃত্যু সনদ।
- জাতীয় পরিচয়পত্র: মৃত ব্যক্তি এবং সকল আবেদনকারী বা ওয়ারিশগণের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা জন্ম নিবন্ধন সনদ।
- আবেদনপত্র: নির্ধারিত ফরম পূরণ করে মৃত ব্যক্তির নিকটাত্মীয়ের স্বাক্ষরযুক্ত আবেদন।
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি: সকল উত্তরাধিকারীর পাসপোর্ট ও স্ট্যাম্প সাইজ সত্যায়িত ছবি।
- স্থানীয় ওয়ার্ডের প্রত্যয়ন: স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি বা প্রতিবেশীদের মৌখিক বা লিখিত সাক্ষ্য (প্রয়োজন সাপেক্ষে)।
সনদ উত্তোলনের ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া
ওয়ারিশান সনদ সংগ্রহের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ হলেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। নিচে ধাপগুলো আলোচনা করা হলো:
- আবেদন ফরম সংগ্রহ: সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন অফিস থেকে অথবা তাদের অনলাইন পোর্টাল থেকে নির্ধারিত আবেদন ফরম সংগ্রহ করতে হবে।
- কাগজপত্র সংযুক্তকরণ: ফরমের সাথে পূর্বোলিখিত সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করতে হবে।
- ফি প্রদান: নির্ধারিত সরকারি বা দাপ্তরিক ফি জমা দিয়ে রশিদ সংগ্রহ করতে হবে।
- তদন্ত ও যাচাই: সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা সচিব আবেদন ও কাগজপত্র যাচাই করে দেখবে এবং প্রয়োজনে সরেজমিন তদন্ত করতে পারে।
- সনদ প্রাপ্তি: সকল তথ্য সঠিক পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ স্বাক্ষর ও সীলমোহরযুক্ত মূল ওয়ারিশান সনদ প্রদান করবে।
আদালত থেকে সাকসেশন সার্টিফিকেট নেওয়ার নিয়ম
সাধারণত স্থাবর সম্পত্তি, শেয়ার বা ব্যাংকের বড় অঙ্কের টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় সরকারের সনদের পাশাপাশি আদালতের সাকসেশন সার্টিফিকেট বা উত্তরাধিকার সনদ দাবি করে। এক্ষেত্রে দেওয়ানি কার্যবিধি এবং উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫ এর বিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জেলা জজ আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা বা দরখাস্ত দাখিল করতে হবে। আদালত জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে কোনো আপত্তি আছে কি না তা যাচাই করে এবং পরবর্তীতে সন্তুষ্ট হয়ে সার্টিফিকেট ইস্যু করেন।
আইনি সতর্কতা
ওয়ারিশান সনদে কোনো মৃত ব্যক্তির বৈধ ওয়ারিশকে বাদ দেওয়া বা কোনো জাল তথ্য প্রদান করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। ভুয়া তথ্য দিয়ে সনদ গ্রহণ করলে প্রতারণার অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তাই আবেদন করার সময় সকল তথ্য নিখুঁতভাবে প্রদান করা বাধ্যতামূলক। কোনো জটিলতা দেখা দিলে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর শরণাপন্ন হওয়া উচিত।