ভূমিকা ও পটভূমি
বিবাহিত জীবনে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর ভরণপোষণ একটি মৌলিক অধিকার, যা ইসলামি শরীয়াহ এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন উভয় দ্বারাই স্বীকৃত ও সুরক্ষিত। সাংসারিক জীবনে ভুল বোঝাবুঝি বা বিচ্ছেদের পরিস্থিতিতে এই অধিকার আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অনেক সময় স্ত্রীরা স্বামীর অবহেলা বা অস্বীকৃতির কারণে ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত হন। এক্ষেত্রে, আইনি প্রতিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নিবন্ধে আমরা বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী একজন স্ত্রী কখন তার স্বামীর কাছ থেকে খোরপোশ বা ভরণপোষণ পাওয়ার যোগ্য হন এবং কোন পরিস্থিতিতে এই অধিকার প্রভাবিত হতে পারে, তা বিস্তারিত আলোচনা করব।
আইনের বিধানাবলী
বাংলাদেশে একজন বিবাহিত স্ত্রীর ভরণপোষণ বা খোরপোশ পাওয়ার অধিকার কয়েকটি প্রধান আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (The Muslim Family Laws Ordinance, 1961)
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ধারা ৯ বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খোরপোশ পাওয়ার অধিকার প্রদান করে। এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে পর্যাপ্ত ভরণপোষণ প্রদানে ব্যর্থ হন, তবে স্ত্রী ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে পারেন। চেয়ারম্যান একটি সালিশি পরিষদ গঠন করবেন, যারা বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করবে এবং খোরপোশের পরিমাণ নির্ধারণ করবে।
"যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হন, অথবা ভরণপোষণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ না দেন, তবে স্ত্রী চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করতে পারিবেন। চেয়ারম্যান আবেদন পাইলে সালিশী পরিষদ গঠন করিবেন এবং সালিশী পরিষদ স্ত্রীর ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করিবেন।" - ধারা ৯(১), মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১
২. ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (The Code of Criminal Procedure, 1898)
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৩৯৮ (পূর্বে ধারা ৪৮৮) একজন অবহেলিত স্ত্রীকে ভরণপোষণ লাভের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করার অধিকার দেয়। এই ধারার অধীনে, যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেন বা অবহেলা করেন, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট উপযুক্ত তদন্তের পর স্বামীকে স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্য মাসিক ভাতা প্রদানের নির্দেশ দিতে পারেন। এই ধারাটি একটি দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার হিসেবে কাজ করে।
"যদি কোন ব্যক্তি, পর্যাপ্ত সংস্থান থাকা সত্ত্বেও, তার স্ত্রী, সন্তান বা পিতামাতাকে ভরণপোষণ দিতে অবহেলা করেন বা অস্বীকার করেন, তবে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট, সন্তুষ্ট হইয়া, তাহাকে উক্ত ব্যক্তির ভরণপোষণের জন্য মাসিক ভাতা প্রদানের আদেশ দিতে পারিবেন।" - ধারা ৩৯৮, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (প্রাসঙ্গিক অংশ)
৩. পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ (The Family Courts Ordinance, 1985)
পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ এর অধীনে গঠিত পারিবারিক আদালতগুলোও ভরণপোষণ সংক্রান্ত মামলার বিচার করে থাকে। এই আদালতগুলো বৈবাহিক সম্পর্ক, বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং শিশুদের অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত বিষয়াদি নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত। স্ত্রীরা এই আদালতের মাধ্যমেও ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।
কখন স্ত্রী খোরপোশ পাওয়ার যোগ্য?
নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে একজন স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে খোরপোশ বা ভরণপোষণ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারেন:
- স্বামী ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করলে বা অবহেলা করলে - যদি স্বামী পর্যাপ্ত সংস্থান থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীকে ভরণপোষণ না দেন।
- স্ত্রী যদি যুক্তিসঙ্গত কারণে আলাদা থাকেন - যেমন, স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেন, স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দেন, অথবা অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করেন।
- স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করলে - যদি স্বামী প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ব্যতীত বা আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তবে প্রথম স্ত্রী আলাদা থাকলেও খোরপোশ পাবেন।
- স্বামী স্ত্রীকে পরিত্যাগ করলে (Desertion) - যদি স্বামী স্ত্রীকে কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই ত্যাগ করেন বা তার সাথে বসবাস করতে অস্বীকার করেন।
- দেনমোহর অপরিশোধিত থাকলে - যদিও দেনমোহর ও খোরপোশ দুটি ভিন্ন বিষয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে দেনমোহর পরিশোধ না করাও স্ত্রীর ভরণপোষণ দাবিকে শক্তিশালী করতে পারে।
কখন স্ত্রী খোরপোশ পাওয়ার অযোগ্য হতে পারেন?
কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একজন স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার হারাতে পারেন:
- বিনা কারণে স্বামীর সাথে বসবাস করতে অস্বীকার করলে - যদি স্ত্রী কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই স্বামীর সাথে বসবাস করতে অস্বীকার করেন, তবে তিনি ভরণপোষণ নাও পেতে পারেন। তবে, স্বামীর নিষ্ঠুরতা বা দ্বিতীয় বিবাহ একটি যুক্তিসঙ্গত কারণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
- ব্যভিচারে লিপ্ত হলে (Adultery) - যদি স্ত্রী ব্যভিচারে লিপ্ত হন, তবে তিনি ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার হারান।
- ইদ্দতকালীন সময় ব্যতীত - বিবাহবিচ্ছেদের পর মুসলিম আইনে ইদ্দতকালীন সময় (সাধারণত তিন মাস দশ দিন) পর্যন্ত স্ত্রী ভরণপোষণ পাওয়ার যোগ্য। ইদ্দতকাল শেষ হওয়ার পর তিনি আর স্বামীর কাছ থেকে খোরপোশ দাবি করতে পারেন না, তবে দেনমোহর ও অন্যান্য পাওনা দাবি করতে পারেন।
খোরপোশের পরিমাণ নির্ধারণ
খোরপোশের পরিমাণ নির্ধারণের সময় আদালত বা সালিশি পরিষদ নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে:
উপসংহার
বাংলাদেশের আইন একজন স্ত্রীর ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তবে, এই অধিকার প্রয়োগের জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আবশ্যক। স্ত্রীর ন্যায্য অধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইনগুলো শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। যেকোনো আইনি জটিলতার ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যিনি সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারবেন এবং আইনি প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তা করবেন।