ভূমিকা ও পটভূমি
অন্যের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ গ্রহণে জামিনদার বা গ্যারান্টার হওয়া একটি সাধারণ সামাজিক রেওয়াজ। অনেক সময় নিকটাত্মীয় বা বন্ধুত্বের খাতিরে মানুষ না বুঝে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করে থাকেন। কিন্তু আইনগতভাবে একজন গ্যারান্টার মূল ঋণগ্রহীতার সমতুল্য দায় বহন করেন। ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংকের আইনি পদক্ষেপ সরাসরি গ্যারান্টারের ওপর এসে বর্তায়। তাই গ্যারান্টার হওয়ার পূর্বে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এর আইনি পরিণতি সবিস্তারে জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আইনি ভিত্তি এবং চুক্তি আইন
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ঋণের গ্যারান্টির বিষয়টি প্রধানত ১৮৭২ সালের চুক্তি আইন (Contract Act, 1872) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই আইনের ১২৬ ধারা অনুযায়ী গ্যারান্টি হলো এমন একটি চুক্তি, যার মাধ্যমে কোনো তৃতীয় ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ বা দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়।
"কোনো তৃতীয় ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের ব্যর্থতার বিপরীতে তার দায়ভার গ্রহণের যে চুক্তি, তাকে গ্যারান্টি চুক্তি বলা হয়।"
গ্যারান্টারের প্রধান আইনি দায়সমূহ
আইনগতভাবে একজন জামিনদারের দায় বহুমুখী। ঋণগ্রহীতা অর্থ পরিশোধ না করলে নিচের দায়গুলো গ্যারান্টারের ওপর বর্তায়:
- যৌথ দায়বদ্ধতা - আইন অনুযায়ী প্রধান ঋণগ্রহীতা এবং গ্যারান্টার সমভাবে দায়ী থাকেন। ব্যাংক চাইলে সরাসরি মূল গ্রহীতার পাশাপাশি গ্যারান্টারের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।
- অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা - ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে সম্পূর্ণ ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের আইনি দায়িত্ব গ্যারান্টারের ওপর এসে পড়ে।
- সম্পত্তি নিলাম ও ক্রোক - ব্যাংক ঋণের বিপরীতে মামলা করে রায় পেলে গ্যারান্টারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি, ব্যাংক হিসাব বা স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও নিলাম করার ক্ষমতা রাখে।
- সিআইবি (CIB) তে নাম অন্তর্ভুক্তকরণ - মূল ঋণগ্রহীতার পাশাপাশি গ্যারান্টারের নামও বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে খেলাপি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা তার ব্যক্তিগত ঋণ পাওয়ার যোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করে।
গ্যারান্টার থেকে মুক্তির উপায়
চুক্তি আইনের বিধান অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গ্যারান্টার তার দায় থেকে মুক্তি পেতে পারেন:
পরামর্শ ও সতর্কতা
কারো অনুরোধে বা অন্ধ বিশ্বাসের বশে ব্যাংক ঋণে গ্যারান্টার হওয়ার পূর্বে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর্থিক সচ্ছলতা ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে নেওয়া উচিত। মনে রাখবেন, জামিনদার হওয়া মানে কেবল কাগজে স্বাক্ষর করা নয়, বরং অপর ব্যক্তির আর্থিক ঝুঁকির সম্পূর্ণ অংশীদার হওয়া। কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হলে অবিলম্বে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর শরণাপন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়।