ADVOCATE
ABDUR RAHMAN ASAD

TANGAIL JUDGE COURT OF BANGLADESH

চেক ডিজঅনার মামলা: ৫টি ভুল ধারণা যা আপনার ক্ষতি করতে পারে!

10 Aug, 2026 আসাদ টিম সিভিল আইন

ভূমিকা ও পটভূমি

আধুনিক লেনদেনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো চেক। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত আর্থিক আদান-প্রদান পর্যন্ত চেকের ব্যবহার ব্যাপক। কিন্তু যখন একটি চেক ব্যাংকে প্রত্যাখ্যাত হয়, অর্থাৎ ‘ডিজঅনার’ হয়, তখন এটি কেবল একটি আর্থিক সমস্যা নয়, বরং একটি আইনি জটিলতার জন্ম দেয়। বাংলাদেশে চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলা নিরসন হয় ১৯৮১ সালের হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন (Negotiable Instruments Act, 1881) এর ধারা ১৩৮ এর অধীনে। এই আইনটি চেক প্রদানকারীকে তার প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধ করে। তবে, এই আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে, যা প্রায়শই বাদী ও বিবাদী উভয়কেই অযাচিত আইনি জটিলতা এবং ভোগান্তির দিকে ঠেলে দেয়। একজন আইনজীবী হিসেবে, আমি এই প্রবন্ধে চেক ডিজঅনার মামলা সংক্রান্ত ৫টি বড় ভুল ধারণা এবং তার সঠিক আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরবো, যা আপনাকে এই সংক্রান্ত মামলা পরিচালনায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।


চেক ডিজঅনার মামলা সংক্রান্ত ৫টি বড় ভুল ধারণা ও সঠিক ব্যাখ্যা:

ভুল ধারণা ১: চেক ডিজঅনার হলেই সরাসরি মামলা করা যায়।

এটি একটি অত্যন্ত প্রচলিত ভুল ধারণা। চেক ডিজঅনার হলে তাৎক্ষণিকভাবে আদালতে মামলা করা যায় না। হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৯৮১ এর ধারা ১৩৮(১) (বি) অনুযায়ী, চেক ডিজঅনার হওয়ার পর চেক ধারণকারীকে অবশ্যই চেক প্রদানকারীকে একটি লিখিত নোটিশ পাঠাতে হবে, যেখানে চেকের অর্থ পরিশোধের জন্য 30 দিনের সময় দেওয়া হয়। এই নোটিশ সাধারণত রেজিস্টার্ড ডাকযোগে অথবা সমন জারির মাধ্যমে পাঠানো হয়। নোটিশ প্রাপ্তির 30 দিনের মধ্যে যদি চেক প্রদানকারী অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হন, তবেই কেবল মামলা করার অধিকার জন্মায়।

১৯৮১ সালের হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ধারা ১৩৮(১) (বি) অনুযায়ী: “...চেক ধারণকারীকে একটি লিখিত নোটিশের মাধ্যমে চেক প্রদানকারীকে 30 দিনের মধ্যে উক্ত অর্থ পরিশোধ করার জন্য দাবী করিতে হইবে।”

ভুল ধারণা ২: চেক ডিজঅনার মামলা একটি সম্পূর্ণরূপে সিভিল প্রকৃতির মামলা।

অনেকে মনে করেন, চেক ডিজঅনার মামলা কেবল পাওনা আদায়ের জন্য একটি সিভিল মামলা। বাস্তবে, এটি সিভিল প্রতিকার চাইতে পারে, তবে হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৯৮১ এর ধারা ১৩৮ অনুযায়ী এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এই ধারায় চেক ডিজঅনারের জন্য কারাদণ্ড (সর্বোচ্চ এক বছর) বা চেক বর্ণিত অর্থের তিনগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। সুতরাং, এর প্রকৃতি দ্বৈত, যা সিভিল প্রতিকার ও ফৌজদারি শাস্তির সুযোগ দেয়।

ভুল ধারণা ৩: মামলার সময়সীমা খুব দীর্ঘ এবং অনির্দিষ্ট।

চেক ডিজঅনার মামলার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য কঠোর সময়সীমা নির্ধারিত আছে, যা অনেকেই উপেক্ষা করেন। এই সময়সীমাগুলো সঠিকভাবে পালন না করলে মামলা দায়েরের অধিকার বাতিল হয়ে যেতে পারে:

এই নির্দিষ্ট সময়সীমাগুলো অতিক্রম করলে সাধারণত মামলা দায়ের করা যায় না, যদি না আদালত বিশেষ পরিস্থিতিতে তা বিবেচনা করেন।

ভুল ধারণা ৪: চেক ডিজঅনার মামলা শুধু চেক প্রদানকারীর বিরুদ্ধেই করা যায়।

যদিও প্রাথমিকভাবে চেক প্রদানকারীর বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করা হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য ব্যক্তিরাও দায়বদ্ধ হতে পারেন। হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৯৮১ এর ধারা ১৪১ অনুযায়ী, যদি চেক প্রদানকারী একটি কোম্পানি হয় এবং ডিজঅনারের সময় কোম্পানির কার্য পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তি অপরাধটি সংঘটিত হতে সম্মতি দিয়ে থাকেন বা তার অবহেলার কারণে এটি ঘটে থাকে, তবে সেই ব্যক্তি এবং কোম্পানি উভয়ই দায়বদ্ধ হতে পারে। এক্ষেত্রে কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালক বা অন্য কোনো কর্মকর্তা দায়ী হতে পারেন।

ভুল ধারণা ৫: চেক ডিজঅনার হলে ব্যাংক নিজেই আইনগত ব্যবস্থা নেয়।

এই ধারণাটিও সম্পূর্ণ ভুল। ব্যাংক শুধু গ্রাহকের পক্ষে চেক ডিজঅনারের কারণ উল্লেখ করে একটি প্রত্যয়নপত্র প্রদান করে। ব্যাংক নিজে চেক ডিজঅনারের জন্য কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। চেক ধারণকারীকেই তার পাওনা আদায়ে বা অপরাধীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয় এবং সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। ব্যাংক এখানে কেবল একটি সাক্ষী হিসেবে কাজ করে, বাদীর ভূমিকা পালন করে না।

গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরামর্শ

চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলা একটি জটিল আইনি প্রক্রিয়া, যেখানে সময়সীমা, প্রমাণাদি এবং সঠিক আইনি পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপরের ভুল ধারণাগুলো পরিহার করে সঠিক আইনি পথে চলা আপনার জন্য অত্যাবশ্যক। এই ধরনের পরিস্থিতিতে, অভিজ্ঞ একজন আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করা বুদ্ধিমানের কাজ। একজন আইনজীবী আপনাকে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতে এবং আদালতের সামনে আপনার বক্তব্য সুচারুভাবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করতে পারবেন। এর মাধ্যমে আপনি আপনার অধিকার রক্ষা করতে পারবেন এবং আইনি জটিলতা এড়াতে পারবেন।

পেশাদার আইনি পরামর্শ প্রয়োজন?

যেকোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি, জমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা হাইকোর্টের রিট পিটিশনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলুন এডভোকেট আব্দুর রহমান আসাদের সাথে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন WhatsApp করুন কল করুন

সাম্প্রতিক অন্যান্য আইনি পোস্ট

সিভিল আইন

অবৈধ বা রোগাক্রান্ত ব্যক্তির দলিল: জমির সুরক্ষায় আইনি প্রতিকার-

বিস্তারিত পড়ুন
ফৌজদারি আইন

প্রকাশ্যে মাদক উদ্ধার, সাক্ষীর অস্বীকৃতি: সাজা কি সম্ভব? (উচ্চ আদালতের বিশ্লেষণ)

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

ঋণে জর্জরিত? ১৯৯৭ সালের দেউলিয়া আইন আপনার রক্ষাকবচ | জানুন বিস্তারিত

বিস্তারিত পড়ুন
পারিবারিক আইন

দত্তক নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া ও অভিভাবকত্ব আইন: বিস্তারিত বিশ্লেষণ

বিস্তারিত পড়ুন
ফৌজদারি আইন

চেক ডিসঅনার মামলা: খালাস পাওয়ার আইনি কৌশল ও প্রতিরক্ষা!

বিস্তারিত পড়ুন