ADVOCATE
ABDUR RAHMAN ASAD

TANGAIL JUDGE COURT OF BANGLADESH

চেক ডিসঅনার মামলা: খালাস পাওয়ার আইনি কৌশল ও প্রতিরক্ষা!

01 Sep, 2026 আসাদ টিম ফৌজদারি আইন

ভূমিকা ও পটভূমি

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে চেক ডিসঅনার মামলা একটি সাধারণ ফৌজদারি অপরাধে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক লেনদেনে চেক একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলেও, প্রায়শই বিভিন্ন কারণে চেক ডিসঅনারের ঘটনা ঘটে। নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ (Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ধারা ১৩৮ অনুযায়ী, চেক ডিসঅনার একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এর জন্য আর্থিক জরিমানা সহ কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে, প্রতিটি চেক ডিসঅনার মামলাই যে দণ্ডনীয় হবে, এমনটা নয়। অনেক সময় বাদীপক্ষ যথাযথ প্রমাণ বা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়, অথবা অভিযুক্তের পক্ষে শক্তিশালী আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে। এই নিবন্ধে, একজন সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে আমরা চেক ডিসঅনার মামলা থেকে খালাস পাওয়ার বিভিন্ন আইনি উপায় ও কৌশল নিয়ে আলোচনা করব।


চেক ডিসঅনার মামলা কী এবং কেন হয়?

যখন কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ পরিশোধের জন্য চেক প্রদান করেন এবং সেই চেক নির্দিষ্ট ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে অপর্যাপ্ত তহবিল বা অন্য কোনো কারণে ব্যাংক কর্তৃক প্রত্যাখ্যান হয়, তখন তাকে 'চেক ডিসঅনার' বলে। এই ধরনের ঘটনায়, নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ধারা ১৩৮ অনুযায়ী, চেকে উল্লিখিত অর্থ পরিশোধের জন্য চেক প্রদানকারী ব্যক্তি আইনগতভাবে দায়ী থাকেন। যদি চেক প্রদানকারী নোটিশ প্রাপ্তির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে চেক ডিসঅনার মামলা দায়ের করা যেতে পারে।

নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১: প্রাসঙ্গিক ধারা

চেক ডিসঅনার মামলা মূলত নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর কয়েকটি নির্দিষ্ট ধারার অধীনে পরিচালিত হয়। এই ধারাগুলো মামলার প্রকৃতি, প্রক্রিয়া এবং বিচার নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে:

  1. ধারা ১৩৮ (ধারা 138): এটি চেক ডিসঅনারের অপরাধ এবং এর শাস্তির বিধান নিয়ে আলোচনা করে। অপর্যাপ্ত তহবিল বা অন্যান্য কারণে চেক প্রত্যাখ্যাত হলে এই ধারায় মামলা করা হয়।
  2. ধারা ১৪০ (ধারা 140): এই ধারা অনুযায়ী, যদি চেক প্রদানকারী প্রমাণ করতে পারেন যে চেক ইস্যু করার সময় তার কাছে এটি ডিসঅনার হওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল না, তবে তিনি খালাস পেতে পারেন।
  3. ধারা ১৪১ (ধারা 141): কোম্পানি দ্বারা সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা নিয়ে এই ধারা আলোচনা করে।
  4. ধারা ১৪২ (ধারা 142): এই ধারা চেক ডিসঅনার মামলার বিচারিক এখতিয়ার এবং মামলা দায়েরের সময়সীমা নির্ধারণ করে।

খালাস পাওয়ার সহজ আইনি উপায় ও কৌশল

একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি নিম্নলিখিত যুক্তিসঙ্গত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে চেক ডিসঅনার মামলা থেকে খালাস পেতে পারেন:

  1. আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য ঋণ বা দায় না থাকা:নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ধারা ১৩৮ অনুযায়ী, চেকটি অবশ্যই কোনো আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য ঋণ বা অন্য কোনো দায়ের বিপরীতে ইস্যু করতে হবে। যদি অভিযুক্ত প্রমাণ করতে পারেন যে চেকটি কোনো আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য ঋণ বা দায়ের বিপরীতে ইস্যু করা হয়নি (যেমন: বন্ধুত্বের খাতিরে বা কোনো অবৈধ লেনদেনের জন্য), তাহলে তিনি খালাস পেতে পারেন।
"The cheque must have been issued for the discharge, in whole or in part, of any debt or other liability."
  1. চেকটি জামানতস্বরূপ প্রদান:যদি চেকটি ঋণ পরিশোধের জন্য নয়, বরং শুধুমাত্র একটি জামানত (security) হিসেবে প্রদান করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই চেকের ডিসঅনারের জন্য ধারা ১৩৮ প্রযোজ্য হবে না। এক্ষেত্রে, অভিযুক্তকে প্রমাণ করতে হবে যে চেকটি কেবলমাত্র জামানত হিসেবে দেওয়া হয়েছিল এবং এর বিপরীতে কোনো বিদ্যমান ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ছিল না।
  2. চেক চুরি বা জালিয়াতি:যদি অভিযুক্ত প্রমাণ করতে পারেন যে চেকটি চুরি হয়েছে, অথবা তার স্বাক্ষর জাল করে চেকটি তৈরি করা হয়েছে, তাহলে তিনি মামলা থেকে খালাস পাবেন। এক্ষেত্রে পুলিশি রিপোর্ট, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং প্রাসঙ্গিক তথ্যপ্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  3. যথাযথ নোটিশ প্রদান না করা:চেক ডিসঅনার হওয়ার পর, চেক ধারককে অবশ্যই চেক প্রদানকারীকে একটি আইনানুগ নোটিশ (Legal Notice) পাঠাতে হবে এবং উক্ত নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে চেকে উল্লিখিত অর্থ পরিশোধের সুযোগ দিতে হবে। যদি এই নোটিশ সঠিকভাবে না পাঠানো হয়, নোটিশের বিষয়বস্তু অসম্পূর্ণ থাকে, অথবা নির্ধারিত ৩০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই মামলা দায়ের করা হয়, তাহলে অভিযুক্ত খালাস পেতে পারেন।
  4. চেক ইস্যু করার সময়সীমা অতিক্রম:ব্যাংকের কাছে চেক উপস্থাপনের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে, সাধারণত এটি চেকের তারিখ থেকে ৬ মাস। যদি চেকটি এই সময়সীমার মধ্যে ব্যাংকে উপস্থাপন করা না হয় এবং এরপরে ডিসঅনার হয়, তাহলে মামলাটি আইনগতভাবে টিকবে না।
  5. চেক লেখার পর তারিখ বা টাকার অংকে পরিবর্তন (Material Alteration):যদি চেকটি ইস্যু করার পর, চেক প্রদানকারীর অনুমতি ছাড়া চেকের তারিখ, টাকার অঙ্ক বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যে পরিবর্তন (Material Alteration) করা হয়, তবে সেই চেকটি অবৈধ বলে গণ্য হতে পারে এবং এক্ষেত্রে অভিযুক্ত খালাস পেতে পারেন।
  6. চেকের প্রাপককে টাকা পরিশোধ:যদি অভিযুক্ত প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি ইতিমধ্যেই চেকের প্রাপককে টাকা পরিশোধ করেছেন, ব্যাংকের মাধ্যমে হোক বা অন্য কোনো মাধ্যমে রসিদ সহ, তাহলে তিনি খালাস পাবেন। এক্ষেত্রে পরিশোধের প্রমাণপত্র (যেমন: ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রসিদ) অত্যাবশ্যক।
  7. চেক প্রদানকারীর স্বাক্ষর ভিন্নতা বা জালিয়াতি:যদি ব্যাংক 'Signature Differs' বা 'Signature Not Matching' কারণে চেক ডিসঅনার করে এবং অভিযুক্ত প্রমাণ করতে পারেন যে স্বাক্ষরটি তার নয়, অথবা এটি জাল করা হয়েছে, তাহলে তিনি এই মামলা থেকে খালাস পাবেন।
  8. অন্যান্য যুক্তিসঙ্গত কারণ:উপরে উল্লিখিত কারণগুলো ছাড়াও, ক্ষেত্রবিশেষে অন্যান্য যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে যার মাধ্যমে একজন অভিযুক্ত তার নির্দোষিতা প্রমাণ করতে পারেন। যেমন: চেকটি জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল, অথবা চেক প্রদানকারীর মানসিক স্থিতি ঠিক ছিল না ইত্যাদি।

মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় করণীয়

মামলার বিচার চলাকালীন একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। আইনজীবী সাক্ষ্যপ্রমাণ, জেরা ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে আপনার আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন। মামলার প্রতিটি শুনানিতে উপস্থিত থাকা, সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করা এবং আইনানুগ পরামর্শ অনুসরণ করা একজন অভিযুক্তের জন্য অপরিহার্য।

গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

চেক ডিসঅনার মামলার জটিলতা এড়াতে সর্বদা সতর্ক থাকা উচিত। কোনো চেক ইস্যু করার পূর্বে অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত তহবিল আছে কিনা তা নিশ্চিত করুন। যদি কোনো কারণে চেক ডিসঅনার হয়, তবে দ্রুততার সাথে আইনজীবীর পরামর্শ নিন এবং নোটিশ প্রাপ্তির পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধের চেষ্টা করুন। সকল আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্ট (যেমন: ব্যাংক স্লিপ, চুক্তিপত্র, রসিদ) যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করুন।

উপসংহার

চেক ডিসঅনার মামলা একটি জটিল আইনি প্রক্রিয়া হলেও, সঠিক আইনি জ্ঞান, অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তা এবং যুক্তিসঙ্গত প্রতিরক্ষা কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে এই ধরনের মামলা থেকে সহজেই খালাস পাওয়া সম্ভব। মনে রাখবেন, আইন সর্বদা নিরপরাধ ব্যক্তির পক্ষে থাকে এবং আপনার নির্দোষিতা প্রমাণ করার জন্য আপনার কাছে যথেষ্ট আইনি উপায় রয়েছে।

পেশাদার আইনি পরামর্শ প্রয়োজন?

যেকোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি, জমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা হাইকোর্টের রিট পিটিশনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলুন এডভোকেট আব্দুর রহমান আসাদের সাথে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন WhatsApp করুন কল করুন

সাম্প্রতিক অন্যান্য আইনি পোস্ট

সিভিল আইন

অবৈধ বা রোগাক্রান্ত ব্যক্তির দলিল: জমির সুরক্ষায় আইনি প্রতিকার-

বিস্তারিত পড়ুন
ফৌজদারি আইন

প্রকাশ্যে মাদক উদ্ধার, সাক্ষীর অস্বীকৃতি: সাজা কি সম্ভব? (উচ্চ আদালতের বিশ্লেষণ)

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

ঋণে জর্জরিত? ১৯৯৭ সালের দেউলিয়া আইন আপনার রক্ষাকবচ | জানুন বিস্তারিত

বিস্তারিত পড়ুন
পারিবারিক আইন

দত্তক নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া ও অভিভাবকত্ব আইন: বিস্তারিত বিশ্লেষণ

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

ভুল অ্যাকাউন্টে টাকা গেলে আইনি প্রতিকার: ফেরত পাওয়ার উপায়-

বিস্তারিত পড়ুন