ADVOCATE
ABDUR RAHMAN ASAD

TANGAIL JUDGE COURT OF BANGLADESH

চেকের মামলায় বাদী বা আসামী মারা গেলে আইনি প্রতিকার ও করণীয়-

15 Aug, 2026 আসাদ টিম সিভিল আইন

ভূমিকা ও পটভূমি

চেক ডিজঅনার বা চেক প্রতারণার মামলা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু, এই ধরনের মামলায় বাদী (অভিযোগকারী) অথবা আসামী (চেক প্রদানকারী) যদি মামলার চলমান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে মামলার গতিপথ কী হবে তা নিয়ে প্রায়শই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। এই আলোচনায় আমরা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, বিশেষ করে নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং দেওয়ানি কার্যবিধির আলোকে এই জটিল পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করব এবং এর আইনি সমাধান তুলে ধরব।


চেক প্রতারণা মামলার আইনি ভিত্তি

বাংলাদেশে চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলা মূলত নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ (Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ধারা ১৩৮ এর অধীনে পরিচালিত হয়। এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি আর্থিক দায় পরিশোধের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত চেক অপর্যাপ্ত তহবিল বা স্বাক্ষর অমিলের কারণে ডিজঅনার হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নোটিশ ও অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হন, তবে তাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর শাস্তি হতে পারে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা চেকের দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থদণ্ড, অথবা উভয়ই।

"নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ এর ধারা ১৩৮ অনুযায়ী, একটি ব্যাংক কর্তৃক চেক ফেরত দেওয়াকে একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, যদি চেকটি ঋণের বা অন্য কোনো আইনি দায়ের আংশিক বা সম্পূর্ণ পরিশোধের জন্য প্রদান করা হয়ে থাকে।"

বাদী (অভিযোগকারী) মারা গেলে কী হবে?

চেক প্রতারণার মামলায় বাদী যদি মৃত্যুবরণ করেন, তবে ফৌজদারি মামলাটি তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল হয়ে যায় না। যেহেতু এটি একটি অভিযোগভিত্তিক মামলা এবং এর সঙ্গে আর্থিক পাওনা জড়িত, তাই মৃত বাদীর বৈধ উত্তরাধিকারীরা আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে মামলাটি চালিয়ে যাওয়ার অধিকার রাখেন।

  1. আইনি প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্তি: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর বিধান অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে বাদীর মৃত্যুর পর তার বৈধ উত্তরাধিকারীরা (যেমন স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা) আদালতের কাছে মৃত বাদীর স্থলে নিজেদের পক্ষভুক্ত করার আবেদন করতে পারেন। আদালত সাধারণত এই ধরনের আবেদন মঞ্জুর করেন, বিশেষ করে যখন মামলাটি আর্থিক অধিকারের সাথে সম্পর্কিত থাকে।
  2. দেওয়ানি প্রতিকার: যদি ফৌজদারি মামলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না হয় বা জটিল মনে হয়, তবে বাদীর উত্তরাধিকারীরা দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ এর অধীনে মৃত আসামীর সম্পত্তি থেকে পাওনা আদায়ের জন্য একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করতে পারেন।

আসামী (চেক প্রদানকারী) মারা গেলে কী হবে?

আসামীর মৃত্যু ফৌজদারি মামলার গতিপথে একটি ভিন্ন প্রভাব ফেলে।

  1. ফৌজদারি মামলার বাতিল (Abatement): ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, ফৌজদারি দায় সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত (personal liability)। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তির অপরাধের জন্য অন্য কাউকে, এমনকি তার উত্তরাধিকারীদেরও, শাস্তি দেওয়া যায় না। অতএব, যদি চেক ডিজঅনার মামলার আসামী মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি মামলাটি বাতিল (abate) হয়ে যায়। এর অর্থ হল, মৃত আসামীর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি শাস্তি যেমন কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে না।
  2. ঋণের দায় অক্ষুণ্ণ: যদিও আসামীর মৃত্যুতে ফৌজদারি মামলা বাতিল হয়ে যায়, তবে যে ঋণের জন্য চেকটি দেওয়া হয়েছিল, সেই ঋণের দায় সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয় না। মৃত ব্যক্তির স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি থেকে সেই ঋণ আদায়ের অধিকার বাদীর থাকে। এক্ষেত্রে, বাদী বা তার উত্তরাধিকারীরা মৃত আসামীর বৈধ উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ এর অধীনে পাওনা আদায়ের জন্য একটি অর্থ আদায়ের মামলা (Money Suit) দায়ের করতে পারেন। তবে, উত্তরাধিকারীরা মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির মূল্যের অতিরিক্ত কোনো দায় বহন করতে বাধ্য নন।
"ফৌজদারি মামলা ব্যক্তিগত। আসামীর মৃত্যুর সাথে সাথে ফৌজদারি কার্যধারা সমাপ্ত হয়, কিন্তু ঋণের দায় মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির উপর বর্তাতে পারে, যা দেওয়ানি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদায়যোগ্য।"

ফৌজদারি মামলা বনাম দেওয়ানি প্রতিকার

চেক ডিজঅনারের মামলায় ফৌজদারি এবং দেওয়ানি উভয় ধরনের প্রতিকারের সুযোগ থাকে। যদিও নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ এর ধারা ১৩৮ ফৌজদারি প্রতিকার প্রদান করে, তবে চেকটি যে ঋণের জন্য দেওয়া হয়েছিল, সেই ঋণ আদায়ের জন্য দেওয়ানি প্রতিকারের পথ সবসময়ই খোলা থাকে।


উপসংহার

চেকের মামলায় বাদী বা আসামীর মৃত্যু একটি সংবেদনশীল এবং আইনিভাবে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে। একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ এক্ষেত্রে অপরিহার্য। যদিও ফৌজদারি মামলা ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার কারণে আসামীর মৃত্যুতে সমাপ্ত হয়, তবুও আর্থিক পাওনা আদায়ের জন্য দেওয়ানি প্রতিকারের সুযোগ সর্বদা বিদ্যমান থাকে। আইন অনুযায়ী সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ তাদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারে।

পেশাদার আইনি পরামর্শ প্রয়োজন?

যেকোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি, জমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা হাইকোর্টের রিট পিটিশনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলুন এডভোকেট আব্দুর রহমান আসাদের সাথে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন WhatsApp করুন কল করুন

সাম্প্রতিক অন্যান্য আইনি পোস্ট

সিভিল আইন

অবৈধ বা রোগাক্রান্ত ব্যক্তির দলিল: জমির সুরক্ষায় আইনি প্রতিকার-

বিস্তারিত পড়ুন
ফৌজদারি আইন

প্রকাশ্যে মাদক উদ্ধার, সাক্ষীর অস্বীকৃতি: সাজা কি সম্ভব? (উচ্চ আদালতের বিশ্লেষণ)

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

ঋণে জর্জরিত? ১৯৯৭ সালের দেউলিয়া আইন আপনার রক্ষাকবচ | জানুন বিস্তারিত

বিস্তারিত পড়ুন
পারিবারিক আইন

দত্তক নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া ও অভিভাবকত্ব আইন: বিস্তারিত বিশ্লেষণ

বিস্তারিত পড়ুন
ফৌজদারি আইন

চেক ডিসঅনার মামলা: খালাস পাওয়ার আইনি কৌশল ও প্রতিরক্ষা!

বিস্তারিত পড়ুন