ADVOCATE
ABDUR RAHMAN ASAD

TANGAIL JUDGE COURT OF BANGLADESH

বয়স্ক বাবা-মার আইনি সুরক্ষা: বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের এক বিশদ পর্যালোচনা-

22 Aug, 2026 আসাদ টিম পারিবারিক আইন

ভূমিকা ও পটভূমি

বাংলাদেশের সমাজে বয়স্ক বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য এক চিরাচরিত মূল্যবোধ। তবে, আধুনিক জীবনযাত্রা এবং পরিবর্তিত পারিবারিক কাঠামোর কারণে অনেক সময় বয়স্ক বাবা-মাকে অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হতে দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের আইন বয়স্ক বাবা-মায়ের অধিকার রক্ষায় সুনির্দিষ্ট বিধান রেখেছে, যা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের জানা প্রয়োজন। একজন সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে, আজকের এই আলোচনায় আমরা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বয়স্ক বাবা-মায়ের আইনি সুরক্ষা এবং এর প্রতিকারমূলক দিকগুলো বিশদভাবে পর্যালোচনা করব।


পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩: একটি বিস্তারিত আলোচনা

বাংলাদেশের বয়স্ক বাবা-মায়ের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই আইনটি সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে আইনি বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করেছে এবং এর লঙ্ঘন গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।

আইনের মূল উদ্দেশ্য ও পরিধি

এই আইনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বাবা-মায়েদের ভরণপোষণ নিশ্চিত করা এবং তাঁদের প্রতি যেকোনো ধরনের অবহেলা, অযত্ন বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

  1. ভরণপোষণের বাধ্যবাধকতা - বাংলাদেশের প্রত্যেক সন্তান (ছেলে বা মেয়ে) তাঁর বাবা-মায়ের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। যদি একাধিক সন্তান থাকে, তবে সকলকেই সামর্থ্য অনুযায়ী বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে।
  2. ভরণপোষণের সংজ্ঞা - এই আইনে 'ভরণপোষণ' বলতে বাবা-মায়ের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করাকে বোঝায়।
  3. অভিযোগ দায়ের - কোনো সন্তান যদি তাঁর বাবা-মায়ের ভরণপোষণ না দেয় বা তাঁদের প্রতি অবহেলা করে, তাহলে বাবা-মা অথবা তাঁদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।
"প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে।" - পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩
  1. শাস্তির বিধান - আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী, যদি কোনো সন্তান তার বাবা-মায়ের ভরণপোষণ না দেয়, তবে অনধিক এক লক্ষ টাকা জরিমানা হবে এবং অনাদায়ে অনধিক তিন মাস কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। এই অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য।
  2. সম্পত্তির অধিকার - আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী, সন্তান তার বাবা-মাকে তাদের অনুমতি ছাড়া তাদের বাসস্থান থেকে বিতাড়িত করতে পারবে না এবং তাঁদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। এই ধরনের কাজও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।

অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইনি সুরক্ষা

ভরণপোষণ আইনের পাশাপাশি, বাংলাদেশের অন্যান্য আইনেও বয়স্ক বাবা-মায়ের সুরক্ষার বিধান রয়েছে, বিশেষ করে যখন তাঁরা শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।

দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর প্রয়োগ

যদি কোনো সন্তান তার বাবা-মায়ের প্রতি শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করে, তবে দণ্ডবিধির অধীনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।


ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ভূমিকা

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর কিছু ধারা বাবা-মায়ের তাৎক্ষণিক সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে। যেমন: ধারা ১৪৪ অনুযায়ী, শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজনীয় নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন, যা বাবা-মায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধানের নিশ্চয়তা

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো সামাজিক নিরাপত্তা, যার মধ্যে ভরণপোষণের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। যদিও এটি সরাসরি আইনি প্রতিকার দেয় না, তবে এটি অন্যান্য আইনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং দেশের নাগরিক হিসেবে বাবা-মায়ের অধিকারকে সমুন্নত রাখে।

আইনি প্রতিকার ও করণীয়

যদি কোনো বয়স্ক বাবা-মা সন্তানের অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হন, তবে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন:

  1. আইনি পরামর্শ গ্রহণ - একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করে তাঁদের আইনি অধিকার এবং প্রতিকারের উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত পরামর্শ গ্রহণ করা।
  2. অভিযোগ দায়ের - সংশ্লিষ্ট সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ এর অধীনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা।
  3. পুলিশের সহায়তা - যদি শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ থানায় অবহিত করা এবং সাধারণ ডায়েরি (জিডি) অথবা মামলা (এফআইআর) দায়ের করা।
  4. পারিবারিক আদালতে আবেদন - কিছু ক্ষেত্রে, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ এর অধীনেও ভরণপোষণের জন্য আবেদন করা যেতে পারে, যা Family Courts Ordinance, 1985 নামে পরিচিত।

উপসংহার

বয়স্ক বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব শুধু নৈতিক নয়, আইনগতভাবেও অপরিহার্য। বাংলাদেশের আইন তাঁদের সুরক্ষায় যথেষ্ট শক্তিশালী বিধান রেখেছে। সমাজে বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ববোধ বজায় রাখা প্রতিটি সন্তানের মানবিক ও আইনগত কর্তব্য। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বয়স্কদের প্রতি অবহেলা ও নির্যাতন বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সকল সন্তানের উচিত বাবা-মায়ের প্রতি তাঁদের শেষ দিন পর্যন্ত যত্নবান হওয়া এবং তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও ভালোবাসা নিশ্চিত করা।

পেশাদার আইনি পরামর্শ প্রয়োজন?

যেকোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি, জমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা হাইকোর্টের রিট পিটিশনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলুন এডভোকেট আব্দুর রহমান আসাদের সাথে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন WhatsApp করুন কল করুন

সাম্প্রতিক অন্যান্য আইনি পোস্ট

ফৌজদারি আইন

রাস্তা দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ: আইন ও আবেদন প্রক্রিয়া

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

অবৈধ বা রোগাক্রান্ত ব্যক্তির দলিল: জমির সুরক্ষায় আইনি প্রতিকার-

বিস্তারিত পড়ুন
ফৌজদারি আইন

প্রকাশ্যে মাদক উদ্ধার, সাক্ষীর অস্বীকৃতি: সাজা কি সম্ভব? (উচ্চ আদালতের বিশ্লেষণ)

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

ঋণে জর্জরিত? ১৯৯৭ সালের দেউলিয়া আইন আপনার রক্ষাকবচ | জানুন বিস্তারিত

বিস্তারিত পড়ুন
পারিবারিক আইন

দত্তক নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া ও অভিভাবকত্ব আইন: বিস্তারিত বিশ্লেষণ

বিস্তারিত পড়ুন